আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করুন

0
67
মসজিদ
তুরস্কের ব্লু মসজিদের জামায়াতের সাথে নামাজ আদায়

মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের পরিচিতি রয়েছে। যদিও এ দেশের বেশির ভাগ মুসলিম সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট। ইসলামের মৌলিক বিধান নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন। বিয়েবহির্ভূত নারী-পুরুষে দেদার সম্পর্ক রেখেছেন। মদ জুয়া ও নেশার সাথে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছেন, অর্থাৎ ইসলাম পরিপন্থী এমন কোনো কাজ নেই; যার সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় না। কষ্টিপাথরে পরিমাপ করলে হয়তো সেসব মুসলমানের মুসলমানিত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। তবুও এ দেশটি ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশ। দেশটির সংবিধানে যে চার মৌলিক নীতি যথাÑ গণতন্ত্র; সমাজতন্ত্র; বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতা; রাখা হয়েছে, সেগুলোও ইসলামী নীতির সাথে খাপ খায় না। তারপরও হিসাব করা হয় মুসলিম জনসংখ্যার দিক থেকে দেশটি বিশ্বে তিন নম্বর অবস্থানে রয়েছে। আবার মুসলিম জনগোষ্ঠীর দিক থেকে বৃহত্তর হয়েও এ দেশের সংবিধানে রাজনৈতিক কারণে ইসলামের মৌলিক নীতিবোধ ও বিশ্বাসের প্রতিফলন দেখা যায়নি বরং এ দেশের সংবিধান প্রণীত হয়েছে ব্রিটিশ-ভারতে রচিত সংবিধানের আদলে। বাংলাদেশের মুসলমানরা রাষ্ট্রের কাছ থেকে সেভাবে ইসলামী আইন-কানুন ভোগ করতে পারেন না। এ দেশে ধর্ষণ এখন নৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কোনো একজন মুসলিম মেয়ে ধর্ষিত হলে সে ইসলামী বিধান অনুযায়ী বিচার পাওয়ার অধিকার রাখলেও সে বিচার থেকে বঞ্চিত। ঋণগ্রস্ত মানুষ আর্থিকভাবে দেউলিয়া হয়ে গেলেও সে সুদের বেড়াজাল থেকে বের হতে পারে না। আইন-আদালত চলে কুরআন-হাদিসের সাথে সাংঘর্ষিক প্রক্রিয়াতে। এমনকি রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থায় রচিত সুদ থেকেও মুসলমানরা নিজেদের নিরাপদ রাখতে পারেন না। পারিবারিক আইন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের যেকোনো আইনেই এ দেশের সংবিধান মুসলমানদের ধর্মীয় মূল্যবোধকে মূল্যায়ন করতে পারে না।
এসব বিষয়ে যে পরির্তন দরকার, তা নিয়েও কাউকে উচ্চবাচ্য করতে দেখা যায় না। তা সত্ত্বেও বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের পরিচিতি রয়েছে মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে। এ পরিচিতির কারণেই রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য করা হয়েছে। অন্য দিকে, আসাম থেকে আরো কিছু মুসলমানকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কিছু মুসলমান যখন এই সামগ্রিক পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে ইসলামের মৌলিক আইন-কানুনকে রাষ্ট্রের সাথে মিলিয়ে নিয়ে জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন, তখন বলা হচ্ছেÑ এ দেশে ধর্মের নামে কাউকে রাজনীতি করতে দেয়া যাবে না। অথচ রাজনীতি ছাড়া এ বিষয়গুলোর সমাধানও সম্ভব হয়ে ওঠে না। কোনো কোনো মহল থেকে দাবি করা হচ্ছেÑ এ দেশে ধর্মের নামে চলে আসা রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হোক; তাদের এই বক্তব্যও যে একটি রাজনৈতিক বক্তব্য সে কথাও মুসলমানরা বুঝতে ভুল করছেন। একটি দেশের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ গড়ে ওঠে মতাদর্শের ভিত্তিতে রাজনীতিকে কেন্দ্র করে। রাজনীতির মাধ্যমেই রাষ্ট্র পরিচালিত হয়ে থাকে। এ উপমহাদেশেও ইসলাম রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। রাজনীতির জোরেই ধর্মের ভিত্তিতে ভারত-পাকিস্তান নামে আলাদা দু’টি রাষ্ট্রেরও জন্ম হয়েছিল। রাজনীতির কারণেই ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র থেকে বেরিয়ে এসে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পেরেছে। এতদসত্ত্বেও ৯০ শতাংশ মুসলমানের প্রাণের দাবি যে রাজনীতি, তাকে নিষিদ্ধ করার দাবি বারবার উঠে এসেছে।
ইসলামকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করতে না দেয়ার যুক্তি এমন হতে পারে যে, ইসলাম একটি গর্হিত চেতনা। এ চেতনাকে সমাজে প্রবেশ করতে দেয়া যায় না; এটি এমন একটি বিধিবিধান বা দর্শন; যে দর্শনে আবিষ্ট হলে মানুষের পক্ষে আর মানুষ থাকা সম্ভব হয় না। এ ব্যবস্থায় সব মানুষ অমানুষ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে। মানুষ দুর্নীতিতে আকণ্ঠ ডুবে যেতে পারে; সন্ত্রাসী হয়ে উঠতে পারে। ইসলামী দর্শন রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে সমাজে ধর্ষকের সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে, ঘুষখোর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা সৃষ্টি হতে পারে; ঋণখেলাপি রাজনীতিক নেতার জন্ম নিতে পারে। ইসলামী রাজনীতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা হলে ভেজাল খাদ্যদ্রব্য তৈরিতে পারদর্শী ব্যবসায়ীর সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে; নকল ওষুধ তৈরির কারখানা গড়ে উঠতে পারে। কসাই ডাক্তারের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পারে; ব্যাংকের টাকা ডিজিটাল পদ্ধতিতে লোপাট হতে পারে। এমন আশঙ্কা থেকে থাকলে ইসলাম প্রতিষ্ঠা ও ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ করা জরুরি হতে পারে। আর যদি এমন প্রত্যাশা করা যায় যে, ইসলামী আদর্শ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে সমাজ থেকে অনাচার-অবিচার, কদাচার-অত্যাচার, অশ্লীলতা, খুন, ধর্ষণ, জুলুম সমূলে উৎপাটন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে; তা হলে ইসলামী আইন-কানুন ও রাজনীতির বিস্তার ঘটানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। ইসলামী রাজনীতি একটি পরীক্ষিত রাজনীতি। যে রাজনীতির সুশীতল ছায়াতলে এসে এই ভারত উপমহাদেশেও হিন্দু-মুসলিম সাড়ে ৮০০ বছর নির্বিঘেœ মিলেমিশে একসাথে অবস্থান করে এসেছেন। এই রাজনীতি এতটাই পরিচ্ছন্ন যে, এর হাতছানিতে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মানুষ শত শত বছর শান্তিতে ঘুমাতে পেরেছিলেন। ইসলামী রাজনীতি জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, আদর্শে, সভ্যতায় পৃথিবীকে একসময় ভরপুর করে তুলেছিল। ইসলামী রাজনীতির অতীত ইতিহাস যদি সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ হওয়ার ইতিহাস হয়, তাহলে সে রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত করতে দোষ থাকার কথা নয়।
বিশ্বব্যাপী অনেক প্রতিবন্ধকতা; প্রতিকূল পরিবেশ ও সেকুলার রাজনীতির আগ্রাসন থাকার পরও বাংলাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। দরকার শুধু মুসলমানদের ভেতরে সচেতনতা সৃষ্টি করা। এ দেশের মুসলমানরা সপ্তাহের একদিন শুক্রবারে মসজিদে জুমার খুতবা শোনতে সমবেত হন। ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তার পদ্ধতি যদি সবিস্তারে সেখানে আলোচনা করা যায়, তাহলে নিশ্চয় আলোচনা শুনে মুসলমানরা একত্রিত হতে বাধ্য থাকবেন। ইতোমধ্যে সে কাজ অনেক এগিয়েছে। মুসলমানেরা আগের থেকে আরো বেশি সচেতন। সমাজ পর্যবেক্ষণে এমন তথ্যই উঠে আসতে শুরু করেছে। এ দেশে যারা ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত, তারা প্রত্যেকেই ইসলামের মৌলিক বিষয় যেমন তাওহিদ, একত্ববাদ বা কালেমা, নামাজ, রোজা, জাকাত ও হজের বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেন না।
ইসলামী বিধিবিধানে মুসলমানরা অভ্যস্ত হয়ে উঠুক এ ব্যাপারেও তাদের মধ্যে কোনো দ্বিমত দেখা যায় না। যতটুকু মতভেদ লক্ষ করা গেছে, তা হচ্ছে ইসলামকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করার পদ্ধতিতে। কোনো পদ্ধতি প্রয়োগে দ্রুত সমাজে ইসলাম প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে সে ব্যাপারে মতপার্থক্য থাকলেও ইসলাম প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তারা সবাই সহমত পোষণ করেন এবং এখানে ওলামায়ে কেরামদেরও ভিন্নমত একবারেই দেখা যায় না। এসব সহমত সেকুলার রাজনীতিতে ভীতি সঞ্চার করেছে। এই শঙ্কা থেকেই তাবলিগ জামাতকে ভেঙে দেয়া হয়েছে। সুকৌশলে হেফাজতে ইসলামকে দ্বিখণ্ডিত করা হয়েছে এবং ইসলামভিত্তিক অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মেরুদণ্ডও ভেঙে দেয়া হচ্ছে। সেকুলার শক্তি বুঝতে সক্ষম হয়েছে, তাবলিগ জামাত সমাজের তৃণমূল মানুষ থেকে রাজনীতিক, আমলা, ছাত্র, শিক্ষক, ব্যবসায়ীকে টার্গেট করে ইসলামের প্রাথমিক বিষয়গুলোর সাথে পরিচিত করাচ্ছে এবং সে কাজে তারা সফলও হয়েছে। যে দেশে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা চালু নেই, সে দেশে তাবলিগ জামাত ইসলামী শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের প্রাথমিক শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা করেছে। সে জন্য তাবলিগ জামাতকে অনানুষ্ঠানিক ভ্রাম্যমাণ মাদরাসা বলা যেতে পারে। তাবলিগ জামাতের এই মেহনত ইসলাম প্রতিষ্ঠারই মেহনত। হেফাজতে ইসলামও বাংলাদেশে ইসলামী সমাজব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য মূল্যবান অবদান রেখে চলেছে। ইসলামী আইনকানুন, কুরআন-হাদিসের বিশদ ব্যাখ্যায় পারদর্শী একদল মানুষ তৈরির কাজে তারা নিয়োজিত। তাদেরও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সমাজে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা। কাজেই যারা ইসলামকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তারা সবাই যার যার অবস্থান থেকে কাজ করে যাচ্ছেন। সেই কাজের স্বীকৃতি পরস্পর পরস্পরকে দিতে যেন কার্পণ্য না করা হয়। যেন বলা না হয়, শুধু আমরাই সঠিক পথে রয়েছি, অন্য পথগুলো বিভ্রান্তির পথ। বরং বলার চেষ্টা করা হোক, সবাই কিছু না কিছু অবদান রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন; এটি গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আপাতত বড় ধরনের কোনো বিরোধ দৃষ্টিগোচর না হলেও রয়েছে পরস্পরের মধ্যে সমন্বয়হীনতা। এই সমন্বয়হীনতা কেটে উঠে যদি এক কাতারে এসে সবাই একসাথে বাংলাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানায়, তা হলে আর কোনো শক্তি থাকতে পারে না, মুসলমানদের এই আহ্বানকে অবজ্ঞা করার। সেকুলার রাজনীতিকেরা হয়তো ভেবে পেয়েছেন, সেই আহ্বান অত্যাসন্ন। এই চিন্তা থেকেই ইসলামকে প্রতিরোধকল্পে তাবলিগ জামাত, হেফাজতে ইসলামের ভেতরের একতাকে ভেঙে দেয়া হয়েছে। হেফাজতে ইসলাম এখন দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ইসলামভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর পেছেনেও সেঁটে দেয়া হচ্ছে জঙ্গি, সন্ত্রাসী পরিচয়ের তকমা। তারাও মামলা-হামলার লক্ষ্যে পরিণত হয়েছেন। এই পরিপ্রেক্ষিত ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজে নিবেদিত মুসলিমদের উচিত হবে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত ‘ওয়াতা সামু বিহাবল্লিাহহে জামিয়াও’ (আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢভাবে ধারণ করো, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না) নির্দেশনাকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করা। ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য বিদ্যমান ইসলামী সংগঠনগুলো সমানভাবে কাজ করতে হয়তো পারেনি; কমবেশি হয়েছে সেটা যেমন ঠিক; তেমনি এটাও ঠিক যে সবাই তো কিছু না কিছু করেছেন।
এখন দরকার এক টেবিলে বসে নিজেদের মধ্যে যে বিরোধ রয়েছে তা মিটমাট করে নেয়া এবং সম্মিলিতভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যকে সামনে রেখে সবারই এগিয়ে যাওয়া। সেটি করতে দেরি হলে মুসলমানরা অতিসত্বর অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়তে পারে।
লেখক : গবেষক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here