আল মাহমুদ : সনেটে অনন্য

0
22

সনেট মূলত গীতি কবিতারই একটি ধ্রুপদী শিল্পরূপ। কবির একটি মাত্র ভাবকল্পনা একটি ধ্রুপদী নিয়মকে অবলম্বন করে সনেটে রূপায়িত হয়। সনেট এক প্রকার মন্ময় কবিতা। ধ্রুপদী নিয়ম মেনে চলতে হয় বলে সনেট স্বাধীন গীতিকবিতা থেকে স্বতন্ত্র। ‘সনেট’ শব্দটি ইটালিয়ান ‘সনেটো’ (মৃদু ধ্বনি) শব্দ থেকে উদ্ভূত। ইটালিয়ান কবি Petrarch (১৩০৪-৭৪) কবিতার এ প্রকরণের জন্মদাতা। ইটালিয়ান কবি পেত্রার্ক, দান্তে, ট্যাসো প্রমুখেরা কবিতার ইতিহাসে সনেটকে জনপ্রিয় করে তোলেন। পরবর্তীতে ইংরেজি সাহিত্যে সনেটের চর্চা হয়। ষোড়শ শতাব্দীতে Wyatt এবং Surrey সর্বপ্রথম ইংরেজি সনেট লিখেন। ইংরেজি সাহিত্যে সিডনি, শেকসপিয়র, মিলটন, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কিটস, ব্রাউনিং প্রমুখ বিখ্যাত কবিরা সনেট চর্চা করেন। বিশ্বসাহিত্যে সনেটের দু’টি ধারা সৃষ্টি হয় : এক. ইটালিয়ান সনেট, দুই. ইংরেজি সনেট বা শেকসপিরিয়ান সনেট।
আধুনিক বাংলা কাব্যের জনক কবিগুরু মাইকেল মধুসূদন দত্ত সর্বপ্রথম বিদেশী সাহিত্যের সনেট প্রকরণটি বাংলায় আমদানি করেন। তিনি সনেটের জন্মদাতা পেত্রার্কের এবং শেকসপিয়র উভয়ের প্রকরণ ধারণ করেছিলেন। ১৪ অক্ষর সমন্বিত, ১৪ পঙ্ক্তিতে সমাপ্ত, অষ্টক ও ষষ্টকের পর্ব ভাগের নিয়ম ধারণ করে পঙ্ক্তিগুলোর মেলবন্ধনের রীতি রক্ষা করে মধুসূদন দত্ত সনেটকে বাংলা ভাষায় জনপ্রিয় করে তোলেন। ‘বঙ্গভাষা’, ‘কপোতাক্ষ নদ’, ‘সায়ংকালের তারা’ ইত্যাদি সনেটে কবিগুরু মধুসূদনের কবিকল্পনা অখণ্ড ভাবমূর্তিতে প্রকাশ পেয়েছে।

সনেট বাংলা ভাষায় ‘চতুদর্শপদী কবিতা’ হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। মধুসূদনই ‘বাংলা চতুর্দশপদী’ কবিতার পথিকৃৎ। সনেটের সনাতন রীতি সম্পূর্ণ না মানলেও মধুসূদনের সনেট সার্থকতা অর্জন করেছে। পরবর্তী কালে দেবেন্দ্রনাথ সেন, অক্ষয়কুমার বড়াল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মোহিত লাল মজুমদার, প্রমথ চৌধুরী বাংলা সনেট তথা চতুর্দশপদী কবিতার চর্চা করেন। ভাবের দিক থেকে দেবেন্দ্রনাথের সনেট সংহত। অক্ষয় কুমারের সনেটের ভাব ও ভাষা প্রশংসনীয়। এরপর রবীন্দ্রনাথ সনেটকে নিরেট চৌদ্দ পঙ্ক্তির গীতি কবিতায় রূপান্তর করে ফেলেন। এতে একটি অখণ্ড ভাবের প্রকাশ থাকলেও আঙ্গিক দিক দিয়ে চতুর্দশপদী কবিতা মাত্র। প্রমথ চৌধুরীর ‘সনেট পঞ্চাশৎ’ লঘু চতুর্দশপদী কবিতা হিসেবে উল্লেখযোগ্য। মোহিত লাল মজুমদার ‘বঙ্কিমচন্দ্র’ শিরোনামে একটি উৎকৃষ্ট সনেটগুচ্ছ রচনা করেছেন। তিরিশোত্তর আধুনিক কবিদের মধ্যে জীবনানন্দ দাশও সনেট রচনা করেছেন। বাংলা সনেট ১৪ পঙ্ক্তির মধ্যে সীমিত থাকলেও অক্ষর মাত্রায় ১৮ মাত্রা পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। জীবনানন্দ দাশ সনেটের ১৪ ও ১৮ মাত্রার অক্ষর বিন্যাসকে ২২ থেকে ২৮ মাত্রা পর্যন্ত সম্প্রসারিত করেন।

শিল্পীর স্বাধীনতা বলতে একটা কথা আছে। কোনো শিল্পীই নিয়মের ব্যাকরণে আবদ্ধ থাকতে চান না। প্রতিভার ধর্ম নতুনত্বের দিকেই। শুধু নতুনত্ব দিয়ে শিল্পের বিচার হয় না। শিল্প ‘সহৃদয় হৃদয় সংবেদী’ পাঠকের অন্তরে কতটুকু স্থায়িত্ব লাভ করে সেটাই বিচার্য বিষয়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে এক জনের নাম বাংলা সনেটের ইতিহাসে উঠে আসে-তিনি আল মাহমুদ। সমসাময়িক কালে শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, সৈয়দ শামসুল হকসহ অনেকেই সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতা লিখেছেন। পরবর্তীতেও চতুদর্শপদী কবিতা রচনার ধারা অব্যাহত রয়েছে। কবি আল মাহমুদ তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘সোনালী কাবিন’ কাব্যগ্রন্থে ‘সোনালী কাবিন’ শীর্ষক চৌদ্দটি সনেট রচনা করে সমগ্র বাংলা সাহিত্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। ‘সোনালী কাবিন’ প্রকাশিত হবার পর উভয় বাংলায় তথা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি হিসেবে আল মাহমুদের আত্মপ্রকাশ ঘটে। অনেকেই দম্ভ করে কোমর বেঁধে নেমে ছিলেন-সোনালী কাবিনের সনেটগুচ্ছকে অতিক্রম করতে। কিন্তু আজো পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের কোনো কবির পক্ষে সোনালী কাবিনকে অতিক্রম করা সম্ভব হয়নি। জীবনানন্দের ভাষায় বলা যায়-‘এ পৃথিবী একবার পায় তারে/পায় না কো আর’। কবির জীবদ্দশাতে সোনালী কাবিনের ৪০ বছর পার হয়েছে। চল্লিশ বছরের মধ্যে আমরা তার মতো আর কোনো সনেট রচয়িতার সাক্ষাৎ পেলাম না। ভাবে, ভাষায়, ঐতিহ্যের লালনে, শিল্পগুণ বিচারে সোনালী কাবিন যেমন অপূর্ব তেমন অনন্য হয়েই থাকল। ওই চৌদ্দটি সনেট কবি চট্টগ্রামে বসেই লিখেছেন। যে জন্য চট্টগ্রামের সহৃদয় পাঠক গর্ববোধ করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here